Wednesday, February 15, 2017

পরকিয়া

মনটা আমি দিচ্ছি তাকে
শরীরটা দেই অন্য বাঁকে
লুকোছাপা চলছে ভাল
সামলে চলি সব আগল

ঘুরে ফিরে যাচ্ছে দিন
শুধু মনের কাছেই ঋন
ছন্নছাড়া দিনগুলি মোর
কাটছে ভালই এই ঘোর

এভাবে আর কত দিন
সময় বয়ে হচ্ছে লীন
জবাব দেবার সময় হলো
উত্তর আজো অগোছালো

ধমক ধামক দিচ্ছি আজো
আর কতদিন সামলে যাবো
পরকিয়ার খেলাতে এই মজে
দুঃখ শুধু পেলাম কি হারজিতে

Monday, February 13, 2017

বাংলাদেশে মিড লেভেল ম্যানেজার পাওয়া যায় না

বাংলাদেশে মিড লেভেল ম্যানেজার পাওয়া যায় না। আমাদের অসংখ্য ভালো এন্ট্রি লেভেল কর্মী আছে। ফ্রেশ এবং বুদ্ধিমান। আমাদের অনেক ভালো ভিশনারি লিডার আছেন। কিন্তু মাঝখানটা একদম ফাঁকা। মাঝখানের কর্মী নেই, একদম নেই।

এটাই বাংলাদেশের উন্নয়নের সবচে বড় বাধা। মানুষ তো আছে প্রচুর, কিন্তু তাদেরকে ম্যানেজ করার মতো মানুষ নেই। ছোট একটা প্রজেক্ট তুলতেও মাথা খারাপ হয়ে যায়। আমাদের এই শিক্ষাটা নেই।

একজন ভারতের কিংবা শ্রীলংকার ম্যানেজার যেরকম দক্ষ হয়, সময়ের ব্যাপারে যেমন পটু হয়, ডেডলাইন মিস করে না, কিংবা একটা টিমকে যেভাবে ফোকাস রাখতে পারে, আমাদের ছেলেমেয়েরা সেটা পারে না। তারা এটাকে নিজের বাসা-বাড়ি বানিয়ে ফেলে। নয়তো চরম কঠিন বস হয়ে সবার ওপর ছড়ি ঘুরাতে থাকে। এটাকে প্রফেশনালি কীভাবে পরিচালনা করতে হয়, সেটা আমরা শিখিনি এবং শিখছি না।

বাংলাদেশ থেকে একটি বড় অঙ্কের টাকা পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে চলে যায়, তার একটি বড় পরিমাণ হলো তাদের কর্মীরা আমাদের এখানে কাজ করে। এবং এটাকে কিন্তু ফেলে দেওয়া যাবে না। কালকে যদি আপনি এদেরকে দেশ থেকে বের করে দিয়ে নিজেদের লোক দিয়ে চালাতে চান, তাহলে শিল্পগুলো ভেঙে পড়ার সম্ভাবনাই বেশি। আমাদের গ্রোথের সঙ্গে এরা জড়িত। তবে নিশ্চিয়ই এটা কারো কাম্য নয়।  চলুন কয়েকটা সেক্টরের দিকে তাকাই, তাহলে অনেকের ধারণা পরিষ্কার হতে পারে।

প্রথমেই বলি মিডিয়ার কথা। বাংলাদেশের মিডিয়াতে কাজ করেন অসংখ্য সিনিয়র সাংবাদিক এবং এডিটর পাওয়া যাবে। টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে ভালো সিইও পাওয়া যাবে। তবে তাদের স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করার মতো মাঝ পর্যায়ের মানুষ নেই; ম‌্যানেজার নেই। আপনি প্রতিটি হাউজ ধরে ধরে দেখুন। মাথা আছে অনেক; কিন্তু ভালো ম্যানেজার নেই, যারা একেকটি আইডিয়া নিয়ে কাজ করতে পারে, আইডিয়াটাকে সময়মতো তুলে আনতে পারে এবং অনুষ্ঠানটিকে যেভাবে পরিকল্পনা করা হয়েছিল, সেভাবেই ব্রডকাস্ট করতে পারে। আর এটা নেই বলেই প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের প্রধানকে প্রতিটি দিন চিৎকার করতে করতে গলা ব্যাথা করতে হয়। আর যদি সেটা কেউ না করেন, তাহলে সেখানে ভালো অনুষ্ঠান আর হয়ে ওঠে না। আমাদের টিভিগুলোর থেকে যে কলকাতার টিভি আলাদা তার একটি মূল কারণই হলো, মাঝ স্তরের ম্যানেজার কিংবা কর্মীর সংখ্যা এবং তাদের গুণগত মান।

এবারে টেলিকমগুলোর কথা বলি। বাংলাদেশের টেলিকমগুলো প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি বিনিয়োগ করেছে। কারণ এখানে তাদের অল্প খরচে নেটওয়ার্ক করা হয়ে গিয়েছে। এত অল্প জায়গা এত বেশি গ্রাহক পৃথিবীর আর কোথাও নেই। আর সেবা খারাপ দিলেও কারও কিছু আসে যায় না। ফলে তারা ব্যবসা হিসেবে ভালো করেছে। কিন্তু মাঝারি সারিতে ম্যানেজার কি খুব ভালো পেয়েছে? কিংবা দেশে তৈরি হয়েছে? একদম যে তৈরি হয়নি তা নয়। টেলিকমগুলো তাদের কিছু মানুষকে ট্রেনিং দিয়ে তৈরি করে নিয়েছে। কিন্তু তার সংখ্যা খুব কম। বাংলাদেশে টেলিকম শিল্প প্রায় ২০ বছরের। কতজন ভালো ম্যানেজার আমরা পেয়েছি? বাংলাদেশের টেলিকমগুলোর একটা বড় ব্যবস্থাপনা দেখে বিদেশি ম্যানেজাররা। দেশিরা তাদের পাশে থাকে। তবে কেউ কেউ বেশ ভালো করছেন। কিন্তু সেটা পুরো শিল্পের তুলনায় খুব কম।

বাংলাদেশের সফটওয়্যার শিল্পে মাঝারি খাতে কোনোও ম্যানেজার নেই। একদম শূন্য। আমাদের ভালো প্রোগ্রামার আছে। তাদের ব্রেইন আছে। কিন্তু একটা প্রজেক্ট কীভাবে পরিকল্পনা করতে হয়, কীভাবে দায়িত্ব ভাগ করে দিতে হয়, কীভাবে সময়টাকে ভালো করে ব্যবহার করতে হয়, কীভাবে দায়িত্ব নিয়ে প্রজেক্ট তুলে ফেলতে হয়, এই জ্ঞান শূন্যের কাছাকাছি। তারা ব্রিলিয়ান্ট, এই ব্যাপারে কোনোও সন্দেহ নেই। কিন্তু তাদের ব্যবস্থাপনার দক্ষতা একদমই নেই। আমি বাংলাদেশের অসংখ্য সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানকে চিনি, যারা ভালো ম্যানেজারের কারণে সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানটিকে পরের ধাপে নিয়ে যেতে পারছেন না। যিনি শুরু করেছিলেন, তিনি একাই পুরো প্রতিষ্ঠানটিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন, যত দিন পারেন। পরবর্তীতে হাল ধরার আর কেউ তৈরি হচ্ছে না। যেকারণে বাংলাদেশে সফটওয়্যার শিল্প সামনে এগোতে পারবে না। মুখে আপনি যত বিলিয়ন ডলারের কথাই বলুন না কেন, ফলাফল তেমন একটা হবে না। তাই বিগত ২৫ বছর ধরে সেই একই প্যাঁচাল আমরা শুনে যাচ্ছি। সমস্যাটা হলো, ভালো দক্ষ ম্যানেজার।

বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে কিছু ম্যানেজার আছে, তবে তাদের সংখ্যাও খুব কম। সেখানে অসংখ্য বিদেশি ম্যানেজার কাজ করেন, যাদের দক্ষতার কারণে আমাদের পোশাক শিল্পটি সামনে এগিয়ে চলেছে। এর বাইরে আমাদের এমন কোনোও খাত নেই যেখানে সঠিক ম্যানেজার আছে। একটি ব্যাংকে যান, এমনকি প্রাইভেট ব্যাংক, রেস্টুরেন্টে যান, পর্যটন কেন্দ্রে যান, জাহাজে উঠেন, উড়োজাহাজে চড়েন, বিমানবন্দর ব্যবহার করেন, বিদ্যুৎ-গ্যাস ইত্যাদি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলো দেখেন, সব ফাঁকা। মানুষের অভাব নেই। কিন্তু সুন্দর গুছিয়ে দায়িত্ব নিয়ে একটি বিভাগ চালাবে, সেটা নেই। যে কারণে যেখানেই যাবেন, একটা অব্যবস্থাপনা। সব দায়িত্ব যেন প্রতিষ্ঠানের প্রধানের। মাঝখানে যারা আছেন, তারা দায়িত্ব নিতে পারেন না; গুছিয়ে কাজটা করতে পারেন না।

এবারে দেশ পরিচালনার কথা বলবেন? দেখেন ভালো করে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিজে কীভাবে কাজগুলো করছেন। তার পরের ধাপগুলো? সবাই যেন তাকিয়ে আছে সেই একজনের দিকে। আর যাকেই তিনি দায়িত্ব দিচ্ছেন, তিনি রাতারাতি চুরি-ডাকাতি করে, পুরো অব্যবস্থাপনায় ভরে, নিজের আত্মীয় স্বজনদের চাকরি দিয়ে সেই বিভাগটার বারোটা বাজিয়ে দিয়ে চলে যাচ্ছেন।

বাংলাদেশ আরও অনেক ভালো করতে পারত, যদি এই দেশ সঠিক ম্যানেজার পেয়ে যেত।

বাংলাদেশ যে কারণে ভালো ম্যানেজার পায় না কিংবা তৈরি হয় না, তার একটি মূল কারণ হলো শর্টকাট। ক্যারিয়ারে আমরা খুব দ্রুত উপরে উঠে যেতে চাই। সম্ভব হলে প্রধান নির্বাহী (সিইও)। আর যদি ওই প্রতিষ্ঠানের সিইও হতে না পারি, তাহলে নিজেই একটা প্রতিষ্ঠান খুলে সেটার সিইও হয়ে গেলাম। সিইও আমাকে হতেই হবে, গোলাম হোসেন!

বাংলাদেশে যে একটু কাজ শিখে ফেলে কিংবা ভালো ট্রেনিং পায়, সে তখন ভাবতে শুরু করে- ওই প্রতিষ্ঠানের জন্য সেই যোগ্য সিইও। তার সামনে যে আরও ২০ বছরের ক্যারিয়ার আছে, সেটা তার মাথায় থাকে না। কেউ ৩০ বছরের কথা মাথায় রেখে বাংলাদেশে ক্যারিয়ার তৈরি করে না। সবাই মোটামুটি স্বল্পকালীন চিন্তাভাবনা থেকে চাকরি করে। তাই তার দক্ষতা তৈরির খুব একটা প্রয়োজন পরে না। চাকরি তো আর চলে যাচ্ছে না। আর যিনি শিখে ফেললেন, তিনি কয়েকদিন পর থেকেই চিন্তা-ভাবনা শুরু করেন, কীভাবে নিজেই একটি প্রতিষ্ঠানের মালিক হয়ে যাবেন। এটাই বাংলাদেশের কমন চিত্র।

ভালো দক্ষতা সম্পন্ন কর্মী হওয়াটা খুবই কঠিন একটি কাজ। এটা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের লেখাপড়ায় ভালো করার চেয়েও কঠিন। এর জন্য প্রয়োজন সঠিক এটিচিউড এবং ট্রেনিং। এবং সর্বোপরি এমন একটা পরিবেশ, যার মাধ্যমে আমাদের কর্মীরা তাদের কর্মজীবনে প্রবেশ করে একটা সময়ে গিয়ে ভালো ম্যানেজার হয়ে যেতে পারে। বাংলাদেশের কিছু প্রতিষ্ঠান আছে, যারা তাদের কর্মীদের পেছনে প্রচুর বিনিয়োগ করে ট্রেনিং-এর জন্য। এবং তারা ভালো ম্যানেজার পেয়েছে এবং পাচ্ছে বলে আমি জানি। কিন্তু সেই গুটিকয়েক প্রতিষ্ঠানকে বাদ দিলে মোটা দাগে আমাদের দেশে দক্ষ ম্যানেজার তৈরির কোনোও প্রচেষ্টা নেই বললেই চলে।

পাশাপাশি বর্তমান বাংলাদেশের দিকে তাকান। দেখুন, সবাইকে কীভাবে উদ্যোক্তা এবং সিইও বানানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। এটা হলো তরুণ প্রজন্মকে লোভ দেখিয়ে ভুল পথে পরিচালনা করার এক ধরনের ফন্দি। এগুলোতে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়া যায়। যে মানুষগুলো জীবনে একটি প্রতিষ্ঠান তৈরি করেনি, তারাই গিয়ে মাঠে নেমে পড়েছেন উদ্যোক্তা বানানোর। কী ভয়ংকর কথা। আমি নিশ্চিত লিখে দিলাম, এই ছেলেমেয়েগুলো কিছু দিন এই দরজা ওই দরজায় ধাক্কা খাবে, তারপর একদিন হতাশ হয়ে পথে পথে ঘুরে বেড়াবে।

একটি প্রতিষ্ঠানে উদ্যোক্তার যেমন প্রয়োজন, তেমনি ভালো ম্যানেজারের প্রয়োজন আরও বেশি। এবং সংখ্যার পরিমাণ প্রয়োজনটাও অনেক বড়। বাংলাদেশের পরিবেশ উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য মোটেও সহায়ক নয়। এখানে ফান্ডিং জোগাড় করতেই একজনের জীবন শেষ হয়ে যাবে। এবং কেউ সেই ফান্ডিং পেলেও তার যে টার্মস থাকবে, তাতে উদ্যোক্তার আর কিছু থাকে না। ফলে এগুলো ঠিক না করে, সবাইকে উদ্যোক্তা বানাও বলে মাঠে নামিয়ে দেওয়াটা ঠিক কাজ নয়। উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হলে গাছ এমনিতেই বেড়ে ওঠে। আপনাকে চিৎকার করতে হবে না, গাছ তুমি বড় হও।

বাংলাদেশে ভালো ম্যানেজার না হওয়ার আরও একটি দিক হলো পারিবারিক। আমরা আমাদের বাচ্চাগুলোকে পুতু-পুতু করে বড় করি। বিশেষ করে যারা একটু স্বচ্ছল পরিবারে বড় হয়, তারাই আবার ভালো স্কুল কলেজে যেতে পারে এবং সেই ছেলেমেয়েগুলোই কর্মজীবনে বেশি অংশ নিতে পারে। এবং এরাই বড় হয়েছে পুতু-পুতু আদরে।

এই ছেলেমেয়েগুলো গায়ে গতরে অনেক বড় হয়ে গেলেও এদের মানসিক বিকাশ সঠিকভাবে হয়নি। আমাদের ছেলেমেয়েদের শারীরিক বয়স আঠারো হলেও মনের বয়স রয়ে যায় ১০ কি ১২। যখন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে ২৩/২৪ বছর বয়সে, তখন তাদের মানসিক বয়স হলো ১৬ কি ১৭, কিংবা আরও কম। এরা ঠিকমতো গ্লাসে পানি ঢেলে খেতে পারে না, নিজের কাপড়টা আয়রন করতে পারে না। একটা কোনোও সমস্যা দেখলে আশা করে কাজের মানুষ এসে সেটা সমাধান করে দিয়ে যাবে, নিজে মানুষটা যে কিছু একটা করতে পারে, তার যে আশেপাশে আরও কাজ আছে, এটা তারা বুঝতেই পারে না।

আমাদের ছেলেমেয়েদের বড় অংশটাই পরিবারে যেভাবে বড় হয়, তারই প্রতিফলন ঘটে অফিসে এসে। তারা মনে করে, আমার কাজ ইঞ্জিনিয়ারিং, আমি কেন অন্য একটা সমস্যা সমাধান করতে যাব? তারা বুঝতে শেখে না, প্রতিটি অফিস তাকে চাকরি দিয়েছে তাদের কোনোও না কোনোও সমস্যার সমাধান করতে। একটা দায়িত্ব নিয়ে সেই সমস্যাটা যে সমাধান করবে, সেটা তার ব্রেইন ট্রিগার করে না। ফলে যে কোনোও পরিস্থিতিতে তারা নিজেদের কাজটি করেই আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। উপর থেকে কেউ এসে তাদেরকে সাহায্য করবে যেন। আমাদের পরিবারগুলো আমাদের ছেলেমেয়েদেরকে নষ্ট করেছে এবং করছে। আমরা বুঝতেই পারি না, একটি ছেলে বা মেয়েকে নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে নিজের কাজটা করতে দিলে ধীরে ধীরে তার মানসিক শক্তির প্রবৃদ্ধি হবে। যে কারণে আমরা আমাদের আশেপাশের দেশের ছেলেমেয়েদের থেকে মানসিকভাবে অনেক পিছিয়ে থাকি। একজন ২৪ বছরের তরতাজা যুবকের যা করতে পারার কথা, সেটা সে পারে না। সে ওটা পারে ৩৪ বৎসর বয়সে গিয়ে। ততদিনে অনেকটা দেরি হয়ে যায়।

শারীরিক বয়সের সঙ্গে সঙ্গে তার মানসিক বয়সও বাড়তে হবে। আমাদের সমাজে অনেকেই মনে করেন, মনের বয়স বাড়ানোর দরকার নেই, তাহলে বুড়ো হয়ে যাব। এটা খুবই ভুল একটা ধারণা। একজন ৬০ বছরের মানুষ যদি ৩০ বছরের মানুষের মতো আচরণ করে, তাহলে তাকে দিয়ে এই জগতের কোন কাজটা হবে বলুন তো? বাংলাদেশসহ বিশ্বে যারা ভালো করেছে, দেখবেন কেউ তারা পুতুপুতু হয়ে বেড়ে ওঠেনি। তাদের শারীরিক বয়সের সঙ্গে মানসিক বয়সটাও বেড়েছে। তারা ৪০ বছর বয়সে ৪০ বছরের পরিপক্ক মানুষের মতোই তাদের ব্রেইনকে কাজে লাগিয়েছে। কেউ কেউ হয়তো আরও বেশি।

মানসিক বয়স শরীরের সঙ্গে সঙ্গেই বাড়তে হবে। প্রতিটি বয়সের তার নিজস্ব রূপ আছে, জীবন আছে। সেই বয়সে ওই রূপটাই উপভোগ্য।

Sunday, February 12, 2017

কথপোকথন

'একটি মাতৃগর্ভে জমজ দুই শিশুর মধ্যে কথা হচ্ছে।তাদের প্রথমজন দ্বিতীয়জনকে জিজ্ঞেস করলো,- 'তুমি কি প্রসব পরবর্তী জীবনে বিশ্বাস করো?'

'দ্বিতীয়জন বললো,- 'অবশ্যই করি।নিশ্চয় প্রসব পরবর্তী জীবন বলে কিছু আছে।হয়তো প্রসব পরবর্তী জীবনের প্রস্তুতির জন্যই আজ আমরা এখানে।'

'প্রথমজন বললো,- 'আরে বোকা! প্রসব পরবর্তী জীবন বলে কিছুই নেই।তোমার সেই কাল্পনিক জগত কেমন হতে পারে বলতো দেখি?'

'দ্বিতীয়জন বললো,- 'আমি ঠিক জানিনা। তবে হতে পারে সেখানে এখানের(মাতৃগর্ভ) তুলনায় আলো অনেক বেশি হবে।হতে পারে সেখানে আমরা আমাদের পা দিয়ে হাঁটতে পারবো।আমাদের মুখ দিয়ে নিজেরাই খাদ্য গ্রহন করতে পারবো।হয়তো সেই জগতে আমাদের অন্যান্য ইন্দ্রিয় থাকবে যা আমরা এখন কল্পনা করতে পারছিনা।'

'প্রথমজন বললো,- 'এটা নিছক কল্পনা ছাড়া কিছুই নয়।পা দিয়ে হাঁটাহাঁটি? অসম্ভব। মুখ দিয়ে খাদ্য গ্রহন? অলিক কল্পনা। আমাদের শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় যাবতীয় পুষ্টি আসে এই নাড়ির মাধ্যমে।কিন্ত নাড়ির এই স্বল্প দৈর্ঘ্য কখনোই প্রসব পরবর্তী জীবনের পক্ষে যুক্তি হতে পারেনা।প্রসব পরবর্তী জীবন বলে আদৌ কিছু নেই।এটা বাতুলতা।'

'দ্বিতীয়জন বললো,- 'আমি মনে করি প্রসব পরবর্তী জীবন বলে কিছু আছে এবং সেটা এই মাতৃগর্ভের জীবনের চেয়ে ভিন্ন।হতে পারে সেখানে বাঁচার জন্যে আমাদের এই নাড়ির দরকার হবেনা।'

'প্রথমজন উত্তর দিলো,- 'হাধারাম! প্রসব পরবর্তী জীবন বলে যদি কিছু থেকে থাকে,তাহলে সেই জীবন থেকে কখনো কেউ এই জীবনে ফেরত আসেনা কেনো? আসলে প্রসবের পরের জীবন বলতে কিছুই নেই।প্রসব হচ্ছে জীবনের শেষ। এরপর আর কিছু নেই আছে কেবল অন্ধকার আর শুন্যতা।'

''আমি ঠিক জানিনা।'- দ্বিতীয়জন বললো। সে আরো বললো,- 'হতে পারে সে জগতে আমাদের সাথে আমাদের মায়ের দেখা হবে।মা হয়তো সে জগতে আমাদের দেখাশুনা করবেন।'

'প্রথমজন হাসতে লাগলো, আর বললো,- ' মা তুমি 'মা' তে বিশ্বাস করো? এটা সত্যিই হাস্যকর! যদি মা বলে কেউ থেকে থাকে,তাহলে সে এখন কোথায়?'

'দ্বিতীয়জন বললো,- 'সে আমাদের চারপাশে বিরাজমান।সে আমাদের ঘিরে আছে।আমরা তার মাঝে বেঁচে আছি।তাকে ছাড়া এই জগত অসম্ভব।এই পৃথিবী অসম্ভব।'

'প্রথমজন বললো,- 'যেহেতু আমরা মা বলে কাউকে দেখিনা,অনুভব করিনা।সুতরাং, এর যুক্তিসম্মত ব্যাখ্যা এই যে, আসলে মা বলে কেউ নেই।'

'দ্বিতীয়জন মুচকি হেসে বললো,- 'মাঝে মাঝে যখন তুমি নীরব থাকো,তখন মনোযোগ সহকারে যদি খেয়াল করো তাহলে তুমি তার উপস্থিতি টের পাবে।তুমি তার কন্ঠ শুনতে পাবে।বুঝতে পারবে তিনি তার দরদভরা মধুর কন্ঠে উপর থেকে আমাদের ডাকছেন।'

Monday, January 30, 2017

রুবাই

[১]
রাতের আঁচল দির্ণ করে আসল শুভ ঐ প্রভাত,
জাগো সাকী ! সকাল বেলার খোঁয়ারি ভাঙো আমার সাথ
ভোলো ভোলো বিষাদ-স্মৃতি ! এমনি প্রভাত আসবে ঢের,
খুজতে মোদের এইখানে ফের, করবে করুন নয়নপাত ।

[2]
আধার অন্তরীক্ষে বুনে যখন রূপার পাড় প্রভাত,
পাখির বিলাপ-ধ্বনি কেন শুনি তখন অকস্মাৎ?
তারা যেন দেখতে বলে উজল প্রাতের আরশিতে-
ছন্নছাড়া তোর জীবনের কাটল কেমন একটি রাত !

[৩]
“ঘুমিয়ে কেন জীবন কটাস?” কইল ঋষি স্বপ্নে মোর,
“আনন্দ-গুল প্রস্ফুটিত করতে পারে ঘুম কি তোর ?
ঘুম মৃত্যুর যমজ-ভ্রাতা তার সাথে ভাব করিসনে,
ঘুম দিতে ঢের পাবি সময় কবরে তোর জনম-ভোর ।’’

[৪]
আমার আজের রাতের খোরাক তোর টুকটুক শীরীন ঠোঁট
গজল শোনাও, শিরাজী দাও,তন্বীসাকী জেগে ওঠ !
লাজ রাঙা তোর গালের মত দে গোলাপী-রঙ শরাব,
মনে ব্যথার বিনুনি মোর খোঁপায় যেমন তোর চুনোট ।

[৫]
প্রভাত হ’ল ! শরাব দিয়ে করব সতেজ হৃদয়-পুর,
যশোখ্যাতির ঠুনকো এ কাচ করব ভেঙে চখ্ নাচুর ।
অনেক দিনের সাধ আশা এক নিমেষে করব ত্যাগ,
পরব প্রিয়ার বেণী বাঁধন, ধরব বেণুর বিধুর সুর !

[৬]
ওঠো, নাচো ! আমরা প্রচুর করব তারিফ মদ-অলস
ঔ নার্গিস্ আঁখির তোমার, ঢালবে তুমি আঙুর-রস !
এমন কী আর-জদিই তাহা পান করি দশ বিশ গেলাস,
ছয় দশে ষাট পাত্র পড়লে খানিকটা হয় দিল সরস !

[৭]
তোমার রাঙা ঠোঁটে আছে অমৃত-কুপ প্রান-সুধার,
পেয়ালার ঠোঁট যেন গো ছোঁয় না, প্রিয়া ঠোঁট তোমার
ঐ পেয়ালার রক্ত যদি পান না করি শাপ দিও,
তোমার অধর স্পর্শ করে বড় স্পর্ধা তার !

[৮]
আজকে তোমার গোলাপ-বাগে ফুটল যখন রঙীন গুল্
রেখনা পান-পাত্র বেকার, উপচে পড়ুক সুখ ফজুল ।
পান করে নে, সময় ভীষণ অবিশ্বাসী, শত্রু ঘোর,
হয়ত এমন ফুল-মাখানো দিন পাবি না আজের তুল ।

[৯]
শরাব আনো ! বক্ষে আমার খুশির তুফান দেয় দোলা ।
স্বপ্ন-চপল ভাগ্যলক্ষী জাগল জাগ ঘুম-বিভোল !
মোদের শুভদিন চলে যায় পারদ-সম ব্যস্ত পা’য়,
যৌবনের এই বহ্নি নিভে খোজে নদীর শীতল কোল ।

[১০]
আমরা পথিক ধূলির পথের, ভ্রমি শুধু একটি দিন,
লাভের আঙ্ক হিসাব করে পাই শুধু দুখ, মুখ মলিন !
খুঁজতে গিয়ে এই জীবনের রহস্যেরই কূল বৃথাই
অপূর্ণ সাদ আশা লয়ে হবই মৃত্যুর অঙ্কলীন ॥

[১১]
ধরায় প্রথম এলাম নিয়ে বিস্ময় আর কৌতুহল,
তার পর- এ জীবন দেখি কল্পনা, আঁধার অতল ।
ইচ্ছাথাক কি না থাক, শেষে যেতেই হবে, তাই বলি –
এই যে জীবন আসা-যাওয়া আঁধার ধাঁধার জট কেবল !

[১২]
রহস্য শোন সেই সে লোকের আত্মা যেথায় বিরাজে,
ওরে মানব ! নিখিল সৃষ্টি লুকিয়ে আছে তোর মাঝে ।
তুই মানুষ, তুই-ই পশু, দেবতা দানব স্বর্গদূত,
যখন হতে চাইবি রে যা হতে পারিস তুই তা যে ।

[১৩]
স্রষ্টা যদি মত নিত মোর-আসতাম না প্রানান্তেও,
এই ধরাতে এসে আবার যাবার ইচ্চা নেই মোটেও।
সংখেপে কই, চিরতরে নাশ করতাম সমূলে
যাওয়া-আসা জন্ম আমার;সেও শূন্য শূন্য এও !

[১৪]
আত্মা আমার ! খুলতে যদি পারিতাম এই অস্থিমাস,
মুক্ত পাখায় দেবতা-সম পালিয়ে যেতিস্ দুর আকাশ।
লজ্জা কি তোর হ’ল না রে , ছেড়ে তোর ঐ জ্যোতির্লোক
ভিন্-দেশী প্রায় বাস করতে এলি ধরার এই আবাস?

[১৫]
সকল গোপন তত্ত্ব জেনেও পার্থিব এই আবহাওয়ার
মিথ্যা ভয়ের ভয় গেল না ? নিত্য ভয়ের হও শিকার ?
জানি স্বাদীন ইচ্ছামত যায় না চলা এই ধরায়,
যতটুকু সময় তবু পাও হাতে, লও সুযোগ তার ।

[১৬]
ব্যথায় শান্তি লাভের তরে থাকত যদি কোথাও স্থান
শ্রান্ত পথের পথিক মোরা সেথায় জুড়াতাম এ প্রাণ।
শীত-জর্জর হাজার বছর পরে নবিন বসন্তে
ফুলের মত উঠত ফুটে মোদের জীবন মুকুল ম্লান।

[১৭]
বুলবুলি এক হালকা পাখায় উড়ে যেতে গুলিস্থান,
দেখল হাসিখুশী ভরা গোলাপ লিলির ফুল-ভাথান।
আনন্দ সে উঠল গাহি, “মিটিয়ে নে সাধ এই বেলা,
ভোগ করতে এমন দিন আর পাবিনে তুই ফিরিয়ে প্রান !”

[১৮]                                                                                 রূপ-মাধুরীর মায়ায় তোমার য’দিন পার, লো প্রিয়া ,
তোমার প্রেমিক বধুর ব্যথা হরন করো প্রেম দিয়া !          রূপ-লাবনীর সম্ভার  এই রইবে না সে চিরকাল, 
ফিরবে না আর তোমার কাছে  যায় যদি বিদায় নিয়া ।

[১৯]
সাকী ! আনো আমার হাতে মদ পেয়ালা ধরতে দাও !
প্রিয়ার মত ও মদ-মদির সুরত ওয়ালী ধরতে দাও !
জ্ঞানী এবং অজ্ঞানীরে বেঁধে যা’ দেয় গাঁট ছড়ায়,
সেই শরাবের শিকল, সাকী আমায় খালি পরতে দাও ।

[২০]
নীল আকাশের নয়ন ছেপে বাদল-অশ্রুজল ঝরে,
না পেলে আজ এই পানীয় ফুটতনা ফুল বন ভরে ।
চোখ জুড়াল আমার যেমন আজ এ ফোটা ফুলগুলি,
মোর কবরে ফুটবে যে ফুল- কে জানে হায় কার তরে !

[২১]
করব এতোই শীরাজী পান পাত্র এবং পরান ভোর
তীব্র-মিঠে খোশবো তাহার-উঠবে আমার ছাপিয়ে গোর ।
থমকে যাবে চলতে পথিক আমার গোরের পাশ দিয়ে,
ঝিমিয়ে শেষে পড়বে নেশায় মাতাল-করা গন্ধে ওর ।

[২২]
দেখতে পবে যেথায় তুমি গোলাপ লালা ফুলের ভিড়,
জেনো, সেতায় ঝরেছিল কোনো শাহানশা’র রুধির ।
নার্গিস আরগুল-বনোসা’র দেখবে যেথায় সুনীল দল,
ঘুমিয়ে আছে সেথায় গালে তিল ছিল যে সুন্দরীর ।

[২৩]
নিদ্রা যেতে হবে গোরে অনন্তকাল, মদ পিও !
থাকবে নাকো সাথী সেথায় বন্ধু প্রিয় আত্মীয় ।
আবার বলতে আসবে না ভাই বলছি যা তা রাখ্ শুনে—
ঝরছে যে ফুলের মুকুল, ফুটতে পারে আর কি ও ?

[২৪]
বিদায় নিয়ে আগে যারা গেছে চলে, হে সাকী,
চির ঘুমে ঘুমায় তারা মটির তলে, হে সাকী !
শরাব আনো, আসল সত্য আমার কাছে যাও শুনে,
তাদের যত তথ্য গেল হাওয়ায় গলে, হে সাকী !

[২৫]
তুমি আমি জন্মিনিকো—যখন শুধু বিরাম-হীন
নিশীথিনীর গলা ধরে ফিরতো হেথায় উজল দিন;-
বন্ধু, ধীরে চরণ ফেলো ! কাজল-আঁখি সুন্দরীর
আঁখির তারা আছে হেথায় হেথায় হয়ত ধূলির অঙ্কলীন !

[২৬]
প্রথম থেকেই আছে লেখা অদৃষ্টে তোর যা হবার,
তাঁর সে কলম দিয়ে- যিনি দুখে সুখে  নির্বিকার ।
স্রেফ বোকামি, কন্নাকাটি লড়তে যওয়া তার সাথে,
বিধর লখন ললাট-লিপি টলবে না যা জন্মে আর !

[২৭]
ভালো করেই জানি আমি, আছে এক রহস্য-লোক,
যায় না বলা সকলকে তা ভালোই হোক কি মন্দ হোক ।
আমার কথা ধোঁয়ায় ভরা, ভাঙতে তবু পারবো না—
থাকি সে কোন গোপন-লোকে দেখতে যাহা পায় না চোখ ।
[৩২]

খাজা ! তোমার দরবারে মোর একটি শুধু আর্জি এই-
থামাও উপদেশের ঘটা, মুক্তি আমার এই পথেই।
দৃষ্টি-দোষে দেখছ বাঁকা আমার সোজা সরল পথ,
আমায় ছেড়ে ভালো করো ঝাপসা তোমার চক্ষুকেই।

[২৮]
চলবে নাকো মেকি টাকার কারবার আর, মোল্লাজি !
মোদের আবাস সাফ করে নেয় শেয়ান-ঝাড়ুর কারসাজি
বেরিয়ে ভাঁটি-খানার থেকে বলল হেঁকে বৃদ্ধ পীর—
“অনন্ত ঘুম ঘুমাবি কাল পান করে নে মদ আজি !”

[৩৩]
কাল কি হবে কেউ জানে না দেখছ ত হায় বন্ধু মোর !
নগদ মধু লুঠ করে লও, মোছ মোছ অশ্রু লোর।
চাঁদনি-তরল শরাব পিও, হায়, সুন্দর এই সে চাঁদ
দীপ জ্বালিয়ে খুঁজবে বৃথাই কাল এ শূন্য ধরার ক্রোড়!

[৩৪]
প্রেমিকরা সব আমার মতো মাতুক প্রেমের মত্ততায়,
দ্রাক্ষা-রসের দীক্ষা নিয়ে আচার-নীতি দলুক পায়।
থাকি যখন শাদা চোখে, সব কথাতে রুষ্ট হই,
শরাব পিয়ে দল-দরিয়া উড়িয়ে দি ভয়-ভাবনায়।

[৩৫]
মানব-দেহ—রঙে-রূপে এই অপরূপ ঘরখানি—
স্বর্গের সে শিল্পী কেন করল সৃজন কী জানি,
এই ‘লালা-রুখ’,বল্লী-তনু ফুল্ল-কপোল তন্বীদের
সাজাতে হায় ভঙ্গুর এই মাটির ধরার ফুলদানি !

[৩৭]
দোষ দেয় আর ভৎসে সবাই আমার পাপের নাম নিয়া,
আমার দেবী-প্রতিমারে পূজি তবু প্রাণ দিয়া।
মরতে যদি হয় গো আমার শরাব-পানের মজলিশে—
স্বর্গ-নরক সমান, পাশে থাকবে শরাব আর প্রিয়া।

[৩৮]
মুসাফিরের এক রাত্রির পান্থ-বাস এ পৃথ্বীতল—
রাত্রি-দিবার চিত্র-লেখা চন্দাতপ আঁধার-উজল।
বসল হাজার জামশেদ ঐ উৎসবেরই আঙ্গিনায়
লাখ বাহ্ রাম এই আসনে বসে হ’ল বেদখল।

[৩৯]
কারুর প্রাণে দুখ দিও না, করো বরং হাজার পাপ,
পরের মনের শান্তি নশি বাড়িও না তার মনস্তাপ।
অমর-আশিস্ লাভের আশা রয় যদি, হে বন্ধু মোর,
আপনি সয়ে ব্যথা, মুছো পরের বুকের ব্যথার ছাপ।

[৪০]
ছেড়ে দে তুই নিরস বাজে দর্শন শাস্ত্রপাঠ,
তার চেয়ে তুই দর্শন কর প্রিয়ার বিনোদ বেণীর ঠাট্
ঐ সোরাহির হৃদয়-রুধির নষ্কাশিয়া পাত্রে ঢাল,
কে জানে তোর রুধর পিয়ে কখন মৃত্তু হয় লোপাট।

[৪১]
অজ্ঞানেরই তিমির-তলের মানুষ ওরে বে-খবর !
শূন্য তোরা, বুনিয়াদ তোর গাঁথা শূন্য হওয়ার পর।
ঘুরিস অতল অগাধ খাদে, শূন্য মায়ার  শূন্যতায়,
পশ্চাতে তোর অতল শূন্য অগ্রে শূন্য অসীম চর।

[৪২]
লয়ে শরাব-পাত্র হাতে পিই যবে তা মত্ত হয়ে
জ্ঞান-হারা হই সেই পুলকের তীব্র-ঘোর বেদন সয়ে,
কি যেন এক মন্ত্র-বলে যায় ঘটে কি অলৌকিক,
প্রোজ্জ্বল মোর জ্ঞান গলে,যায় ঝর্ণা-সম গান বয়ে।

[৪৩]
“শরাব ভীষণ খরাপ জিনিস মদ্যপায়ীর নেইকো ত্রাণ। ”
ডানে বাঁয়ে দোষদর্শীয় সমালোচক ভয় দেখান—
সত্য কথাই ! যে আঙুরে নষ্ট করে ধর্মমত,
সবার উচিত—নিঙড়ে ওরে করে উহার রক্ত পান !

[৪৪]
আমার কাছে শোন উপদেশ—কাউকে কভু বলিসনে—
মিথ্যা ধরায় কাউকে প্রাণের বন্ধু মেনে চিলসনে !
দু:খ ব্যথায় টলিসনে তুই, খুঁজিসনে তার প্রতিষেধ,
চাসনে ব্যথার সমব্যথী, শির উঁচু রাখ ঢলিসনে !

[৪৫]
মউজ চলুক ! লেখার যা তা লিখল ভাগ্য কালকে তোর,
ভুলও কেহ পুঁছল না কি থাকতে পরে তোর ওজর !
ভদ্রতারও অনুমতি কেউ নিল না অমনি ব্যস্
ঠিকঠাক সব হয়ে গেল ভুগবি কেমন জীবন-ভোর !

[৪৬]
সেই সাথে চাই—সৃষ্টি খাতায় দিক কেটে সে আমার নাম,
আমি চাহি স্রষ্টা আবার সৃজন করুন শ্রেষ্টতর
আকাশ ভুবন এই এখনই, এই সে আমার আঁখির’পর ।
কিংবা আমার যা প্রয়োজন তা মিটাবার দিক সে বর ।

[৪৭]
নাস্তিক আর কাফের বলো তোমারা লয়ে আমার নাম
কুৎসা গ্লানির পঙ্কিল স্রোত বহাও হেথা অবিশ্রাম ।
অস্বীকার তার করব না যা ভুল করে যাই, কিন্তু ভাই,
কুৎসিৎ এই গালি দিয়েই তোমরা যাবে স্বর্গধাম ?

[৪৯]
মসজিদ মন্দির গির্জায় ইহুদ-খানায় মাদ্রাসায়
রাত্রি-দিবস নরক-ভীতি স্বর্গ-সুখের লোভ দেখায় ।
ভেদ জানে আর খোঁজ রাখে ভাই খোদার যারা রহস্যের
ভোলে না এই খোশ-গল্পের ঘুম-পাড়ানো কল্পনায় ।

[৫০]
এক হাতে মোর তসবী খোদার, আর-হাতে মোর লাল গেলাস
অর্ধেক মোর পুণ্য-স্নাত, আধেক পাপে করল গ্রাস ।
পুরোপুরি কাফের নহি, নহি খাঁট মুসলিমও—
করুন চোথে হেরে আমায় তাই ফিরোজা নীল আকাশ ।

[৫১]
একমণী ঐ মদের জালা গিলব, যদি পাই তাকে,
যে জালাতে প্রাণের জ্বালা নেভাবার ওষুধ থাকে !
পুরানো ঐ যুক্তি তর্কে দিয়ে আমি তিন তালাক,
নতুন করে করব নকাহ্ আঙুর-লতার কন্যাকে ।

[৫২]
বিষাদের ঐ সওদা নিয়ে বেড়িয়ো না ভাই শিরোপরি,
আঙুর-কন্যা সুরার প্রেম ক’রে যাও প্রেম ক’রে যাও প্রাণ ভরি !
নিষিদ্ধা ঐ কন্যা, তবু হোক সে যতই অ-সতী,
তাহার সতী মায়ের চেয়ে ঢের বেশী সে সুন্দরী !

[৫৩]
স্বর্গে পাব শরাব-সুধা এ যে কড়ার খোদ খোদার,
ধরায় তাহা পান করলে পাপ হয়, এ কোন বিচার?
‘হামজা’ সাথে বেয়াদবি করল মাতাল এক আরব,-
তুচ্ছ কারণ—শরাব হারাম তাই হুকুমে ‘মোস্তফার’!

[৫৪]
“রজব শাবান পবিত্র মাস” বলে গোঁড়া মসলমান,
“সাবধান, এই দু’মাস ভাই কেউ ক’রো না শরাব পান ।”
খোদা এবং তার রসুলের ‘রজব’ ‘শাবান’ এই দু’মাস
পান-পিয়াসীর তরে তবে সৃষ্ট বুঝি এ রমজান ?

[৫৫]
শুক্রবার আজ, বলে সবাই পবিত্র নাম জুম্মা যার,
হাত যেন ভাই খালি না যায়, শরাব চলুক আজ দেদার ।
এক পেয়লি শরাব যদি পান করো ভাই অন্যদিন,
দু’পেয়ালি পান করো আজ বারের বাদশ জম্মা বার ।

[৫৭]
মুগ্ধ করো নিখিল হৃদয় প্রেম-নিবেদন কৌশলে
হৃদয়-জয়ী হে বীর, উড়া্ও নিশান প্রিয়ার অঞ্চলে ।
এক হৃদয়ের সমান নহে, লক্ষ মসজিদ আর কাবা
কি হবে তোর তীর্থে ‘কাবা’র শান্তি খোঁজ হৃদয় তলে ।

[৬০]
মদ পিও আর ফুর্তি করো—আমার সত্য আইন এই !
পাপ পূন্নের খোজ রাখি না—স্বতন্ত্র মোর ধর্ম সেই ।
ভাগ্য সাথে বিয়ের দিনে কইনু, “দিব কি যৌতুক?”
কইল বধূ, “খুশি থাকো, তার বড় যৌতুক সে নেই !”

[৬১]
কে সোরাহি সুরা দিও, একটু রুটির ছিলকে আর
প্রিয়া সাকী, তাহার সাথে একখানি বই কবিতার,
জীর্ণ আমার জীবন জুড়ে রইবে প্রিয়া আমার সাথ,
এই যদি পাই চাইব নাকো তখৎ আমি শাহানশার !

[৬২]
হুরী বলে থাকলে কিছু—একটি হুরী, মদ খানকি
ঘাস-বিছানো ঝর্ণাতীরে, অল্প বয়েস, বৈতালিক—
এই যদি পাস, স্বর্গ নামক পুরনো সেই নরকটায়,
চাসনে যেতে, স্বর্গ ইহাই, স্বর্গ যদি থাকেই ঠিক ।

[৬৩]
যতক্ষণ এ হাতের কাছে আছে অঢেল লাল শরাব
গেঁহুর রুটি, গরম কোর্মা কালিয়া আর শিক-কাবাব,
আর লালা-রুখ প্রিয়া আমার কটীর-শয়ন-সঙ্গিনী,-
কোথায় লাগে শাহান-শাহের দৌলৎ ঐ বে-হিসাব !

[৬৪]
দোষ দিও না মদ্যপায়ীর তোমরা, যারা খাওনা মদ,
ভালো করার থাকলে কিছু, মদ খাওয়া মোর হ’ত রদ্ ।
মদ না পিয়েও, হে নীতিবিদ্, তোমরা যে-সব কর পাপ,
তাহার কাছে আমরা শিশু, হইনা যতই মাতাল-বদ !

[৬৫]
খুশী-মাখা পেয়ালাতে ঐ গোলাপ-রক্ত মদ-মধুর !
মধুরতর পাখীর গীতি, বেণুর ধ্বনি বীণার সুর ।
কিন্তু ঐ যে ধর্মগোঁড়া-বুঝল না যে মদের স্বাদ,
মধুরতম—রয় সে যখন অন্ততঃ পাঁচ যোজন দূর ।

[৬৬]
চৈতী-রাত্রে খুঁজে নিলাম তৃণাস্তৃত ঝর্ণা তীর,
সুন্দরী এক হুরী নিলাম, পেয়ালা নিলাম লাল পানির ।
আ,ার সা, েকইল গাহার তুৎসা গ্লানির ঝড় তুফান,
ভুলেও মনে হ’ল না মোর স্বর্গ নরকের নজীর ।

[৬৭]
সাকী-হীন ও শরাব-হীনের জীবনে হায় সুখ কী বল ?
নাই ইরাকী-বেণুর ধ্বনির জমজমাটি সুর-উছল
সুখ নাই ভাই সেথায় থেকে, এই জগতের তত্ত্ব শোন,
আনন্দ-হীন জীবন-বাগে ফলে শুধু তিক্ত ফল ।

[৬৮]
মরুর বুকে বসাও মেলা, উপনিবেশ আনন্দের,
একটি হৃদয় খুশী করা তাহার চেয়ে মহৎ ঢের ।
প্রেমের শিকল পরিয়ে যদি বাঁধতে পার একটি প্রাণ—
হাজার বন্দী মুক্ত করার চেয়েও অধিক পুণ্য এর ।

[৬৯]
শরাব এবং প্রিয়ায় নিয়ে, সাকী, হেথায় এলাম ফের ।
তৌবা করেও পাইনে রেহাই হাত হতে ভাই এই পাপের ।
”নূহ’ আর তাঁর প্লাবন-কথা শুনিয়ো নাকো আর, সাকী,
তার চেয়ে মদ-প্লাবন এনে ডুবাও ব্যথা মোর বুকের !

[৭৩]
মধুর, গোলাপ-বালার গালে দক্ষিন হাওয়র মদির শ্বাস,
মধুর, তোমার রুপের কুহক মাতায় যা এই পুস্পাবাস ।
যে গেছে কাল গেছে চলে এলো না তার ‘ম্লান স্মৃতি’
মধুর আজের কথা বল, ভোগ করে নাও এই বিলাস ।

[৭৪]
শীত ঋতু ঐ হল গত বইছে বায় বসন্তের,
জীবন পুথির পাতাগুলি পড়বে ঝ’রে, নাই দেরি ।
ঠিক বলেছেন দরবেশ এক’ “দুষিত বিষ এই জীবন,
দ্রক্ষার রস বিনা ইহার প্রতিষেধক নাই, হেরি ।”

[৭৫]
সরো‘র মতন সরল-তনু টাটকা-তোলা গোলাপ-তুল,
কুমারীদের সঙ্গে নিয়ে আনন্দে তুই হ’মশগুল !
মৃত্যুর ঝড় উঠবে কখন আয়ুর পিরাণ ছিড়বে তোর—
পড়ে আছে ধুলায় যেমন ঐ বিদীর্ণ্ দল মুকুল !

[৭৭]
আমার সাথী সাকী জানে মানুষ আমি কোন জাতের,
চাবি আছে তার আঁচলে আমার বুকের সুখ দুখের ।
যেমনি মেজাজ মিইয়ে আসে গেলাস ভরে দেয় সে মদ,
এক লহমায় বদলে গিয়ে দূত হয়ে যাই দেব লোকের ।

(১২১)
নিত্য দিনে শপথ করি—করব তৌবা আজ রাতে,
যাব না আর পানশালাদে, ছোঁব না আর মদ হাতে ।
অমনি আঁখির আগে দাঁড়ায় গোলাপ ব্যাকুল বসন্ত
সকল শপথ ভুল হয়ে যায়, কুলোয় না আর তৌবাতে ।